পুনর্গঠন নয়, নতুন রূপরেখার নামে গাজাবাসীকে দেওয়া হচ্ছে দাসত্বের প্রস্তাব

Jun 06, 2026

পুনর্গঠন নয়, নতুন রূপরেখার নামে গাজাবাসীকে দেওয়া হচ্ছে দাসত্বের প্রস্তাব

নিউস ত্রিপুরা প্রতিনিধিঃ গত কয়েক মাস ধরে এক গভীর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কৃষ্ণগহ্বরে হারিয়ে গেছে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা। নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ, গণবাস্তুচ্যুতি আর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার পরও এই মানবিক বিপর্যয় সমাধানের জন্য নেওয়া রাজনৈতিক উদ্যোগগুলো স্থবির হয়ে পড়ে ছিল। এই অচলাবস্থার মধ্যে গত মে মাসের শেষের দিকে জাতিসংঘের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত এবং বর্তমান ‘বোর্ড অব পিস’-এর গাজাবিষয়ক উচ্চপ্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ ১৫ দফার একটি নতুন রূপরেখা নিয়ে হাজির হয়েছেন। এটিকে গাজায় স্থিতিশীলতা, সুশাসন এবং পুনর্গঠন ফিরিয়ে আনার একটি রোডম্যাপ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে সতর্কতার সঙ্গে সাজানো আমলাতান্ত্রিক ভাষা এবং চতুর ধাপগুলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা। ওয়াশিংটনভিত্তিক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সাইদ আরিকাত গাজার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এভাবেই নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।তার মতে, এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য গাজার পুনর্গঠন নয়, বরং গাজাবাসীকে কোণঠাসা ও বাধ্য করা। মানবিক দায়বদ্ধতার ‘পুনর্গঠন’ প্রক্রিয়াকে এখানে পরিণত করা হয়েছে রাজনৈতিক নিপীড়নের এক মোক্ষম অস্ত্রে।এই রূপান্তরের বিষয়টি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি এই প্রস্তাবের মূল ভিত্তি। প্রস্তাবটির কাঠামো বিশ্লেষণ করলেই এর আসল উদ্দেশ্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।গাজার বিধ্বস্ত সাধারণ মানুষের জন্য যা এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি মানবিক প্রয়োজন—সেই বৃহৎ পরিসরের ‘পুনর্গঠন’ বিষয়টি রাখা হয়েছে প্রস্তাবের ১৫ নম্বর অর্থাৎ একেবারে সর্বশেষ দফায়। তাও শর্ত সাপেক্ষে; বলা হয়েছে, কোনো এলাকা সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্রীকরণ করা হয়েছে এবং তা গাজার নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে এসেছে বলে প্রত্যয়িত হলেই কেবল সেখানে পুনর্গঠন কাজ শুরু হতে পারবে। অর্থাৎ, ফিলিস্তিনিরা তাদের ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল বা মৌলিক অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের অধিকার পাওয়ার আগে প্রথম ১৪টি শর্ত পূরণ করতে হবে। যার মধ্যে রয়েছে হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ, পর্যায়ক্রমে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, গাজার নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন গভর্নিং বডি গঠন করা—যা একটি ‘সংস্কারকৃত’ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগপর্যন্ত সেখানকার বেসামরিক ও নিরাপত্তা বিষয়গুলো পরিচালনা করবে।এই ধারাবাহিকতাই বলে দেয় এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কী। গাজার ধ্বংসলীলাকে এখানে অবিলম্বে সমাধানযোগ্য কোনো মানবিক বিপর্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং একে ব্যবহার করা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের স্বার্থানুকূল একটি নতুন ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার হাতিয়ার বা ‘লেভারেজ’ হিসেবে। সহজ কথায়, পুনর্গঠনকে এখানে যুদ্ধাস্ত্র বানানো হয়েছে।এই প্রস্তাবটি মূলত যুদ্ধ-পরবর্তী সেই পুরোনো ফর্মুলাকেই নতুন করে সামনে এনেছে, যা ইসরাইল এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা বারবার বলে আসছে: কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের বাইরে কোনো অস্ত্র বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকা পর্যন্ত কোনো পুনর্গঠন হবে না। এর মাধ্যমে গাজার চলমান ধ্বংসযজ্ঞের সমস্ত দায় চাপানো হচ্ছে হামাসের অস্ত্র সমর্পণ না করার সিদ্ধান্তের ওপর। কিন্তু এই যুক্তি ফিলিস্তিনি বাস্তবতার মূল প্রেক্ষাপটকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আড়াল করে। ফিলিস্তিনের সশস্ত্র প্রতিরোধ কোনো শূন্যতা থেকে তৈরি হয়নি, কিংবা গাজার এই সামরিকায়নকে গত কয়েক দশকের অবরোধ, দখলদারিত্ব, ভূখণ্ড খণ্ডবিখণ্ডকরণ, অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ এবং রাজনৈতিক বিকল্পগুলোর পরিকল্পিত ধ্বংসসাধন থেকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।ফিলিস্তিনিদের সশস্ত্র প্রতিরোধকে এর পেছনের মূল কারণগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখানোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল মূলত প্রতিরোধকেই মূল সমস্যা হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে, আর ইসরাইলি নিপীড়নের মূল কারণগুলোকে রাজনৈতিকভাবে অদৃশ্য করে দিচ্ছে। সমসাময়িক ফিলিস্তিন কূটনীতিতে এই উলটো বয়ান তৈরি এক বড় বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে, যেখানে ইসরাইলের সীমাহীন ক্ষমতার মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে ফিলিস্তিনিদের আচরণ নিয়ন্ত্রণের ওপরই পুরো মনোযোগ ধরে রাখা হয়।যত দিন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক কূটনীতি এই বৈষম্যমূলক চিন্তা দ্বারা পরিচালিত হবে, তত দিন গাজা এই অন্তহীন গোলকধাঁধায় আটকা পড়ে থাকবে: যেখানে পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি বারবার দেওয়া হবে, বেছে বেছে কিছু বাস্তবায়ন করা হবে এবং শেষ পর্যন্ত তা সংঘাত সমাধানের জন্য নয়, বরং সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতিগুলোকে ধামাচাপা দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হবে।